Helix pomatia বাংলার নদী ও সামুদ্রিক শামুক বিদেশের মাটিতে রমরমা ব্যবসা, কর্মসংস্থানের নতুন দিশা প্রান্তিক মানুষের।
নিজস্ব প্রতিবেদক, বসিরহাট: একসময় প্রাচীনকালে মানুষেরা এর উপর নির্ভর করতো খাওয়া ও শারীরিক গঠন। তখন থেকেই শামুকের প্রচলন ছিল। ইউরোপ দক্ষিণ এশিয়ায় গবেষণা কেন্দ্রে বিভিন্ন সময় এই শামুকের গুনাগুন নিয়ে চর্চা হয়েছে। এখনো বিদেশের মাটিতে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের কাছে সাদা শামুকের চাহিদা আছে। তাই ভারত তথা বাংলা নদীমাতৃক এলাকা গুলোতে এখনো প্রচুর মানুষ এই সাদা শামুক চাষ কিংবা জল থেকে তুলে কর্মসংস্থানের নতুন দিশা দেখছে।
সীমান্ত ও সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকায়, যেখানে এখনো মানুষ খাল-বিল থেকে শামুক ধরে তা বিক্রি করে সংসার নির্বাহ করেন। বসিরহাটের স্বরূপনগর, বসিরহাট ১, হিঙ্গলগঞ্জ, সন্দেশখালি ১ ও ২নং ব্লক সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এখনো শয়ে শয়ে মানুষ সামুক বিক্রি করে দিন গুজরান করছেন।
এই শামুক গুলি সাধারণত নদীর পাড়ে, খালে, বিলে ঘুরে বেড়ায়। যার বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘হেলিক্স পোমাটিয়া’। বাংলায় যার ডাকনাম ‘গুগলি’। সেগুলিকেই ধরে এক শ্রেণীর মানুষ। তারপর একসাথে অনেকটা সংগ্রহ করে সেগুলি বিক্রি করে দেয়। সেই এক টিনের বাক্স শামুকের দাম মাত্র ৮০ টাকা। সেগুলি কিনে ব্যাপারীরা কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে বিক্রি করেন। ছত্তিশগড়, ঝাড়খন্ড, নাগাল্যান্ড, মনিপুর ও ত্রিপুরার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়। সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে এই শামুক যথেষ্ট জনপ্রিয়। শামুকের শক্ত খোলার মধ্য থেকে ভেতরের মাংসটিকে ছাড়িয়ে আলাদা করে রান্না করা হয়। আদিবাসী তথা উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষ এগুলি খেতে পছন্দ করেন।রাজ্যে, ভারতের বিভিন্ন নামিদামি রেস্তোরাঁ হোটেলগুলোতে শামুকের রেসিপি বিদেশী মানুষদের জন্য অত্যন্ত প্রিয় খাবার। এর গুণাগুণ অনেক। উচ্চমানের শামুক বিক্রি করে দিন গুজরান করেন। ব্যবসায়ীরা এদের কাছ থেকে কম দামে কিনে নিয়ে গিয়ে চড়া দামে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে এবং বিদেশে রপ্তানি করে। সুন্দরবনের শামুক বিক্রেতারা বলেন, “ভোর তিনটের সময় আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি এই শামুক ধরার জন্য। বিভিন্ন নদীর পাড়, খালে-বিলে গিয়ে আমরা শামুক ধরি। এক টিন শামুক জোগাড় করতে প্রায় দুই থেকে তিন ঘন্টা সময় লাগে। তার থেকে আয় হয় মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। “পেটের দায়ে আমাদের এই শামুক কুড়িয়ে বেড়াতে হয়। জলে নামতেও ভয় লাগে। কারণ কোথাও সাপ বা বিষাক্ত পোকামাকড় থাকতে পারে। সেগুলি কামড়ালে আমাদের জীবনহানিও হতে পারে।” বর্ষাকাল চলে গেলে শামুক আর পাওয়া যায় না। তাই বছরের অন্য সময় আমরা ইট ভাটায় শ্রমিকের কাজ করি। কিন্তু ভাটার কাজ শেষ হয়ে গেলে আবার এই শামুক ধরার কাজে ফিরতে হয়।” মাতিন গাজী নামক এক ক্রেতা বলেন, “এই শামুকগুলি সাধারণত ভিন রাজ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়। আমাদের দিন আনি দিন খাওয়া ইনকাম। এই শামুক বিভিন্ন রাজ্যে বেচেই আমাদের সংসার চলে।” পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের দীনেশ মজুমদার কেন্দ্রের সভাপতি রঞ্জিত মুখোপাধ্যায় বলেন, “ভারতবর্ষের অনেক শ্রেণীর মানুষ এখনো এই শামুকের মাংস খায়। কারণ এটা ভীষণ উপকারী ও সহজপাচ্য। ইউরোপ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে আমাদের দক্ষিণ ভারতে একটি শামুকের ওপর গবেষণা হয়েছিল, সেখানে উঠে এসেছিল উন্নতমানের পুষ্টিকর স্বাস্থ্যকর রোগ প্রতিরোধ খাবার। কিন্তু আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষ অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্য শ্রেণীর মানুষ একেবারে অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ছে। যার ফলে কর্মসংস্থানের অভাব ঘটেছে। তার ফলে এখনো মানুষকে শামুক বিক্রি করে পেট ভরাতে হচ্ছে।” বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুকল্যাণ বৈদ্য বলেন, “বসিরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে শাসক দলের নেতারা নিরীহ মানুষকে কেন্দ্রের একাধিক প্রকল্প থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। যার ফলে আজকে তাদের শামুক বিক্রি করে সংসার চালাতে হচ্ছে।” বিষয়টি নিয়ে আইএনটিটিইউসি রাজ্য সম্পাদক কৌশিক দত্ত বলেন, “২০১১ সালের আগে বাম আমলে মানুষ পিঁপড়ের ডিম খেয়ে বাঁচতো। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর মানুষের অর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রীর চালু করা বিভিন্ন প্রকল্পে মানুষ খুব কম দামে রেশনের সামগ্রী পাচ্ছে। বাংলার মানুষ আগের থেকে অনেক ভালো আছে।” একদিকে খাল বিলের নোংরা জলে নেমে জল বাহিত চর্ম রোগের ভয়ে অন্যদিকে সাপ তথা বিষাক্ত পোকা মাকড়ের কামড়ে জীবনহানির আশঙ্কা থেকে যায়।