Sunday, April 6, 2025
Ad

ভারতের আইনে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বলে কোনো বিষয় নেই : মানিক ফকির।

Must read

উদ্বাস্তুরা শরণার্থী নাকি অনুপ্রবেশকারী?

মানিক ফকির, কলকাতা: উদ্বাস্তুরা শরণার্থী নাকি অনুপ্রবেশকারী? এই তত্বেই ভারত তথাকথিত হিন্দু রাষ্ট্র। প্রশ্নটা হচ্ছে উদ্বাস্তুরা শরণার্থী নাকি অনুপ্রবেশকারী? এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষ এক অর্থে হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে গেল। গেল এই কারণেই বলছি, এই ধরনের বিষয়ে আমি বেশ কিছুটা আগেই বলে থাকি যুক্তি, তথ্য ও ঘটনা পরম্পরা অনুধাবন করে। আর এ কাজকে সফল করতে দেশের সরকার নিয়েছিল নানা রকম কৌশল। তবে এই অবাস্তব কাজকে বাস্তবে রূপ দিতে দেশের হিন্দুত্ববাদী সরকার সময় নিয়েছিল একশো বছর। বলতে দ্বিধা নেই, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তারা তাদের ভাবনা, নীতি ও আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়ে দিয়েছে। মূলত ১৮৭৫ সালে হিন্দুত্ববাদী নেতা দয়ানন্দ সরস্বতী আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রচার করেছিলেন, বহিরাগত আর্যরাই প্রকৃত পক্ষে ভারতের শাসন কর্তা, প্রভু, বা মালিক। তার সেই পথকে অনুসরণ করে হিন্দুত্ববাদী ব্রাহ্মণ্যবাদী মনুবাদীরা ১৯২৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। বর্তমান ভারতের ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিই হচ্ছে সেই হিন্দুত্ববাদী আরএসএসের রাজনৈতিক সংগঠন। কারণ আইন অনুসারে কোনো গণসংগঠন বা ধর্মীয় সংগঠন রাজনীতিক ক্ষমতায় থাকতে পারে না।ভারতের স্বাধীনতা বিরোধী, ব্রিটিশ সরকারের বন্ধু সংগঠন আরএসএস ভারতের স্বাধীনতার পূর্ণলগ্নে চেয়েছিল ভারতের সংবিধান তৈরি হোক ঋষি মনুর বিধান অর্থাৎ মনুসংহিতা অনুসারে। তাঁরা মনে করতেন ঋষি মনু ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আইনজ্ঞ। ১৯২৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল,দীর্ঘ ১০০ বছর ব্যাপী ধীরে ধীরে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বা আর্য রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে তাদের মূল কৌশল ছিল, ব্রিটিশ সরকারের অনুকরণে “ডিভাইড এন্ড রুল” পদ্ধতি। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের মতোই আরএসএস ও হিন্দু মুসলমান বিভাজন করে নানা কৌশলের মাধ্যমে তারা তাদের সংগঠনের শ্রী বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। আর সেই সব নানা রকম কৌশলের মধ্যে যেমন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানো ছিল অন্যতম কৌশল, তেমনি অন্যতম সেরা কৌশল ছিল, “হিন্দুরা শরনার্থী ও মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী“ তত্ত্ব। যা ছিল পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও বৈদেশিক আইনের একশো শতাংশ মিথ্যা ব্যাখ্যা। ভারতের সংবিধান ও ভারতের আইনে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বলে কোনো বিষয় নেই। অথচ দেশভাগের নামে বাংলা ও পঞ্জাব ভাগের সঙ্গে সঙ্গে দু পাড়ের কোটি কোটি ছিন্নমূল দেশান্তরিত মানুষের নতুন পরিচয় তৈরি হয়েছিল, তারা রিফিউজি, তারা উদ্বাস্তু অথবা তারা শরণার্থী।বলতে দ্বিধা নেই, এই তিনটি মিথ্যা ও মন ভোলানো শব্দ ক্রমশ গভীর ভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল দেশান্তরিত মানুষের মগজে ও মনে, অন্তরের অন্তঃস্থলে। যে কারণে, গত কয়েক বছর ধরে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ অবৈধ অভিবাসীদের সম্পর্কে বার বার সত্যি কথা গুলো বলেও উদ্বাস্তুদের চেতনা ফেরাতে পারেনি। আর সেটাই চেয়েছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্র নেতারা দশকের পর দশক ধরে। দেশের লোকসভা, রাজ্য সভায় এমনকি মিডিয়ার সামনে ও বিভিন্ন জনসভায় একই কথা বলেছিল, অমিত শাহ সহ বিজেপির নেতারা। তাঁরা বলেছিলেন, বিজেপি শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেবে আর অনুপ্রবেশকারীদের ভারত থেকে তারাবেই। এই একই কথা বারবার কানে শুনেও উদ্বাস্তুদের তাবড় তাবড় শিক্ষিত মানুষ গণ অমিত শাহর ভয়াবহ কথার অর্থ বোঝেন নি। হাতে গোনা যে কয়েকজন উদ্বাস্তু উচ্চ শিক্ষিত মানুষ বিষয়টা বুঝতে পেরে আন্দোলনের পথে ঝাঁপানোর চেষ্টা করেছিলেন, ক্রমে ক্রমে তারাও উদ্বাস্তু সমাজের মানুষের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠেছিলেন। ফলত দেশের ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকে যে চোখে দেখতে চেয়েছিলেন সেই পথ তাদের প্রশস্ত হয়ে গিয়েছে । ভারতের আইনে শরণার্থী বা উদ্বাস্তু শব্দটা কোনো দিনই ছিল না, নেই ও। তবে আন্তর্জাতিক আইনে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী বিষয় আছে। যেমন মায়ানমারের অসংখ্য রোহিঙ্গা আন্তর্জাতিক আইনে শরণার্থী। তারা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর নানা দেশে। যেমন ১৯৭১ এ বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় সে দেশ থেকে ভারতে আসা অসংখ্য বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক আইনে শরণার্থী ছিলেন। কিন্তু এখন তারা আর শরণার্থী নয়, তারা অনুপ্রবেশকারী। সুতরাং বলা যেতে পারে এই “শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী” তত্ত্বের মাধ্যমেই ভারত সরকার দেশে বসবাস করা কোটি কোটি উদ্বাস্তু বা অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ শুরু করেছে। তবে এই ভয়াবহ মিথ্যা তত্ত্ব হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের। আজকের নয়, ১৯৯৮ সালে ১৩ মাসের বিজেপি সরকার ও ঘোষণা করেছিল, তারা অনুপ্রবেশকারীদের ওয়ার্ক পারমিট হিসাবে লাল কার্ড দেবে আর দেশের নাগরিকদের জন্য সবুজ কার্ড দেবে। তথ্য বলছে সে সময় ও তারা অবৈধ মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী আর অবৈধ হিন্দুদের শরণার্থী হিসাবে আখ্যায়িত করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গণ সংগঠনের নেতাদের বোকা বানিয়ে ছিল। আর এই ভয়ানক খেলার “শেষ চালটি” সরকার চেলে দিয়েছে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা তথাকথিত CAA এর মাধ্যমে। সেখানে সরকার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে নির্দিষ্ট তিনটি দেশের নির্দিষ্ট ছয়টি ধর্মাবলম্বী মানুষ যারা ধর্মীয় নির্যাতনের কারণে বা নির্যাতনের ভয়ে ভারতে এসে ভারত সরকারের কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। এবং পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও ফরেনার্স অ্যাক্ট ছাড় পেয়েছেন কেবল মাত্র তারাই CAA ২০১৯ পোর্টালে আবেদন করার যোগ্য। অথচ এই সরল ভাষাটা বোধগম্য হচ্ছেনা দেশের কোটি কোটি উদ্বাস্তু মানুষের মাথায়।

বাস্তবে অনুপ্রবেশকারীরা পৃথিবীর কোথাও নাগরিকত্ব পাবার আবেদন করতে পারে না। অথচ উদ্বাস্তুদের বহু অতি বড় শিক্ষিত মানুষ ও নিজেকে শরণার্থীর আসনে বসিয়ে CAA এর কিছু কিছু টেকনিক্যাল বিষয় সংশোধন করার দাবি তুলে ফাঁদে পড়েছেন। তাদের দাবী ছিল, যেহেতু CAA পোর্টালে আবেদনকারীকে তার জন্মভূমি দেশের বা পূর্বের দেশের নাম উল্লেখ করার পক্ষে ডকুমেন্ট জমা দিতে হবে, তাই তারা আপত্তি তুলেছিল, যাতে এই ডকুমেন্ট দিতে না হয়। অথচ সরকার তাদের দাবী মেনে নিলেও যে তাদের পক্ষে নাগরিকত্বের আবেদন করার কোনো অধিকার নেই দেশের পাসপোর্ট অ্যাক্ট, ফরেন অ্যাক্ট ও ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অনুযায়ী, এমনকি সেই পোর্টালে আবেদনের চেষ্টা করে ব্যক্তিগত গোপন তথ্য গুলো দিয়ে দিলেই যে সাংঘাতিক বিপদ ঘটে যেতে পারে, এ কথা কানে শুনেও মনের ভিতরে ঢুকাতে চায়না উদ্বাস্তু বা অনুপ্রবেশকারীদের বৃহৎ অংশের মানুষ। তাদের ধারণা ২০১৪ সালের আগে যে সব উদ্বাস্তু হিন্দুরা ভারতে এসে বসবাস করছেন, তারা সবাই ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। অথচ বাস্তবটা ঠিক তার উল্টো।সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস অমৃতা সিনহার এমনি একটি রায়ের অরিজিনাল প্রতিলিপি যুক্ত করছি এই নিবন্ধে। মামলাটি ছিল দুলাল চন্দ্র শীল বনাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মামলাটির রিট পিটিশন, যথা ডাবলু পি এ ১৫৬৬৯ অফ ২০২৪। অভিযুক্ত দুলাল শীলের বাড়ি ছিল পূর্ব বর্ধমান জেলার গুসকরা শহরে। তিনি আদালতে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন, তিনি তাঁর পরিবার সহ ভারতে এসেছেন ২০১৪ সালের অনেক আগে। ২০০৯ সালের বেশ কয়েকটি সরকারি ডকুমেন্ট তিনি জমা দিয়েছিলেন আদালতে। তিনি দেখাতে পেরেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে তার কেনা জমির দলিল, তার নামে গ্যাস এর কাগজ, ভোটার কার্ড,আধার কার্ড, প্যান কার্ড,রেশন কার্ড, ভারতের পাসপোর্ট ইত্যাদি। তথাপি দুলাল বাবু ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না শীল জেলখানায় বন্দি হয়ে আছেন। শাস্তি শেষে ভারত সরকার তাদের ফেরত পাঠাবে তাদের পূর্বের দেশে। অর্থাৎ বাংলাদেশে। জাস্টিস অমৃতা সিনহার কাছে বিজেপি নেতা দুলাল শীল ও স্বপ্না শীল কেউই দেখাতে পারেননি যে তারা ভারতে পাসপোর্ট অ্যাক্ট ও ফরেন অ্যাক্টে ছাড় পাবার পক্ষের কোনো ডকুমেন্ট। যদিও দুলাল বাবুর এডভোকেট ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি ভারতের স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশ করা পাসপোর্ট সংশোধনী আইনের কপি ও বৈদেশিক আইনের অর্ডার দেখিয়ে জাস্টিস অমৃতা সিংহাকে বলেছিলেন, এই দুটি ডকুমেন্ট অনুসারে দুলাল শীল ও স্বপ্না শীল অনুপ্রবেশকারী হয় কি করে! তারা হিন্দু, তারা অনুপ্রবেশকারী নন। তথাপি জাস্টিস অমৃতা সিনহা দুলাল বাবু ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না শীলের বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারা অনুসারে শাস্তি ঘোষণা করেছেন।

- Advertisement -

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest article