এক সময় ছিলেন অভিভাবক এখন তিনি সম্পূর্ণ একা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, বর্ধমান: পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া-২ ব্লকের অগ্রদ্বীপ পঞ্চায়েতের চর কালিকাপুর গ্রামের ভাগীরথীর বাঁধের নিচে ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটি ভাঙা চালা ঘরই ষাটোর্ধ্ব অসিত মণ্ডলের একমাত্র আশ্রয়। বাইরে থেকে দেখলে গা ছমছমে জঙ্গল বলে মনে হবে। দরজার দুই পাশে লতাপাতা জড়িয়ে আছে, আর ভিতরে দুর্গন্ধে ভরা টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট চালাঘর, যেখানে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন তিনি। এক পাশে চৌকিতে শুয়ে থাকেন অসিতবাবু, আর অন্য পাশে তাঁর একমাত্র সঙ্গী একটা গরু। কেবল একটি গরু নিয়ে টিকে থাকা এই মানুষটির দিন কাটে কলার থোঁড় বিক্রি করে। সেখান থেকে যা সামান্য আয় হয়, তাই দিয়েই চলে খাবার।তালিকায় থাকে দু’টো আলুসেদ্ধ আর একমুঠো ফ্যান ভাত, তাও দিনে মাত্র একবার। না আছে বিদ্যুৎ, না আছে জল, না আছে পরিচয়ের কোনও সরকারি স্বীকৃতি। বৃদ্ধ অসিত বাবু বলেন, ‘আমার কেউ নেই, এখানে একাই থাকি খুব কষ্ট হয়। চারিদিকে জল জমে গেছে, খুব অসুবিধা হচ্ছে। এখানে প্রচুর সাপ, মশা, ইঁদুর আছে। সিদ্ধ ভাত খাই একবেলা।’
এক সময় তাঁর সব ছিল, নদীয়া জেলার শান্তিনগরে ছিল জমি-জমা, ভাই-বোন, ঘরবাড়ি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সব ভাইবোনকে গৃহস্থ করে দিলেও নিজের বিয়ে করা হয়নি। মতবিরোধে পরিবার ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন তিরিশ বছর আগে। প্রথমে নদীয়ার সাধুগঞ্জে গিয়ে বসতি গড়েন। সেখানেও জমি কিনে থাকার পর বোনের সঙ্গে মনোমালিন্যে সব ছেড়ে বারো বছর আগে চলে আসেন পূর্ব বর্ধমানে, চর কালিকাপুরে। এখনও তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। তাঁর ভোটার কার্ড ছিল শান্তিনগরের ঠিকানায়। সেখান থেকে নাম বাদ পড়েছে অনেক আগেই। আর নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার বহুবার চেষ্টা করেও ফল হয়নি কিছুই। তাই কোনও সরকারি সুবিধাও পান না। একজন মানুষ, যিনি এক সময় পরিবারের অভিভাবক ছিলেন, আজ তিনি সম্পূর্ণ একা, পরিচয়হীন, ঝোপে ঘেরা চালাঘরে দিন গুনছেন জীবনের শেষ প্রহরগুলোর।